মোদি মাথা ঝোঁকালেন, গণতন্ত্র মহিমান্বিত হলো

মোদি মাথা ঝোঁকালেন, গণতন্ত্র মহিমান্বিত হলো

দেড় বছর ধরে যে তিন আইনকে কৃষি সংস্কারের শেষ কথা মনে করেছিলেন, সিদ্ধান্ত থেকে বিন্দুমাত্র পিছু না হটার পণ করেছিলেন, রাতারাতি সেই অবস্থান থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরে আসার পেছনে রাজনীতিই যে একমাত্র কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কোনো বিশ্লেষক নেই যিনি এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বলতে দ্বিধান্বিত। আরও স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন ঘাড়ে নিশ্বাস না ফেললে প্রধানমন্ত্রী হয়তো আরও কিছুকাল কৃষকদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করাতেন। ‘উঁচু’ মাথা ঝোঁকাতেন না। এই ‘অমোদিচিত’ আচরণ কতটা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হওয়ার লক্ষণ, আর কতটা নিজের অধিষ্ঠান ধরে রাখার তাগিদ, কতটা হৃদয় পরিবর্তনের কাহিনি, কতটাই–বা মোক্ষম রাজনৈতিক চাল—সেই বিতর্ক পাশে রেখে বলা যেতে পারে, এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমা আরও একবার প্রতিভাত হলো। সেই মহিমা, যা গণতান্ত্রিক প্রতিস্পর্ধা গড়ে তুলে অমিত বলীয়ান শাসককে পরাজয় ও ভুল স্বীকারে বাধ্য করে। ইন্দিরা গান্ধীর মতো নরেন্দ্র মোদিও চিনলেন গণতান্ত্রিক শক্তির সেই স্বরূপ।

এই দেড় বছর কী করেনি মোদি-সরকার? কোভিডকে ঢাল করে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে। খণ্ডিত সংসদীয় অধিবেশনে ‘ব্রুট সংখ্যাগরিষ্ঠতা’র জোরে বিনা আলোচনায় ধ্বনি ভোটে বিল পাস করিয়েছে। দিল্লি অবরোধে আগুয়ান কৃষকদের ওপর পুলিশ অকথ্য অত্যাচার করেছে। গোটা দেশ তার সাক্ষী। হাড় হিম ঠান্ডা ও প্রবল দাবদাহে কৃষকদের জেদ ভাঙতে লাঠি, গ্যাস ও জলকামান প্রয়োগে রাষ্ট্রশক্তি দ্বিধা করেনি। বন্ধ করা হয়েছে খাদ্য-পানীয়র জোগান। পেরেক পুঁতে রাস্তা কেটে ঠেকানো হয়েছে দিল্লিমুখী কৃষকদের মিছিল। রাষ্ট্রশক্তি ও শাসকের অন্ধ অনুগামী বাহিনী কৃষকদের কপালে সেঁটে দিয়েছে ঠগ, জোচ্চোর, সন্ত্রাসবাদী, দেশদ্রোহী ও খলিস্তানি তকমা। রুজু হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। গ্রেপ্তার হয়েছেন অগুনতি কৃষক। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্রূপে তাঁরা ‘আন্দোলনজীবী’, পারিষদবর্গের বয়ানে কৃষকবেশী পাকিস্তানি। সাত শ কৃষকের মৃত্যুও প্রধানমন্ত্রীকে বিচলিত করেনি। শোক প্রকাশ তো দূরের কথা, একটিবারের জন্যও সীমান্তে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। রাজি হননি আলোচনায় বসতে। ঋজু, টান টান ও আলোচনাবিমুখ থেকে বুঝিয়েছেন তাঁর রাজ্যপাট চালানোর অভিধানে নরমপন্থার স্থান নেই। রাজদণ্ডের প্রয়োগই প্রথম ও শেষ কথা। একমাত্র উত্তর।

মোদি অবশেষে উপলব্ধি করেছেন, কৃষকদের ক্ষুব্ধ রেখে কৃষি সংস্কার হয় না। জরুরি অবস্থার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ইন্দিরাকে করতে হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত হয়ে। মোদির রাজনৈতিক ললাটলিখন জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে অন্তত আরও তিনটি মাস। জরুরি অবস্থা জারির কারণে প্রয়াত ইন্দিরা আজও ‘স্বৈরতন্ত্রী’ বলে অভিহিত হন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চোখে নরেন্দ্র মোদিও তথৈবচ। ‘স্বৈরতন্ত্রী’। ‘ফ্যাসিস্ট’।

ভাগ্যিস ভারতীয় গণতন্ত্র বছর বছর কোথাও না কোথাও ভোটের বন্দোবস্ত করে এবং দিল্লির শাসককে লক্ষ্ণৌ ঘুরে আসতে হয়! উত্তর প্রদেশে ভোট না থাকলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন কি? কিংবা আর একটু ঘুরিয়ে বললে, লক্ষ্ণৌ দখল নিশ্চিত হলে এমন ‘অমোদিচিত’ আচরণের সাক্ষী কি দেশ হতে পারত? উত্তরটা প্রধানমন্ত্রীর আচরণেই স্পষ্ট। তিনি ঘোরতর সন্দিহান। তাই কিল হজমে বাধ্য হয়েছেন।

পাঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে কৃষক আন্দোলনের ঢেউ উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছানোর পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। একসময় এই বিস্তীর্ণ জাটভূমির বেতাজ বাদশাহ ছিলেন চৌধুরী চরণ সিং। কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলে লোকদলের ছাতার তলায় তিনি নিয়ে এসেছিলেন মুসলমান, আহির (যাদব), জাট, গুজ্জর ও রাজপুতদের। ইংরেজি আদ্যক্ষর অনুযায়ী ‘MAJGR’। বরফ-জমাট এই জাত-মিশ্রণ চরণ সিং তো বটেই, পুত্র অজিত সিংকেও নিশ্চিন্তে রেখেছিল। ২০১৩ সালের মুজফফরনগরের জাট-মুসলমানের দাঙ্গা সেই সমীকরণে তুলে দেয় অলঙ্ঘনীয় এক প্রাচীর। রামমন্দির আন্দোলনের পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী জাতিচেতনার বিকাশ ঘটিয়ে মোদির বিজেপি নতুন যে মেরুকরণের রাজনীতির জন্ম দেয়, তার মোকাবিলায় সব প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। কৃষক আন্দোলন সেই মরা গাঙের বান।

ঈশান কোণে মেঘের আনাগোনায় সন্দিগ্ধ মাঝির মতো মোদিও সন্দিহান ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা রাকেশ টিকায়েতের পদচারণে। রাকেশের উদ্যোগে জাট-মুসলমানের নতুন জোটবদ্ধতার মধ্যে তিনি অশনির সংকেত পেয়েছেন। গত জানুয়ারিতে মুজফফরনগরের মহাপঞ্চায়েতে লাখো কৃষকের জমায়েতে জাট মুসলমান নেতা গোলাম মহম্মদ জাউলার হাত ধরে টিকায়েত ‘আল্লাহ হু আকবর’ হাঁক পাড়লেন। দুই ভাই রাকেশ ও নরেশকে দুই পাশে রেখে গোলাম মহম্মদ জাউলাও বললেন, ‘এখন অতীত আঁকড়ে বসে থাকলে চলবে না। কৃষকদের জোট বাঁধার সময় এসেছে। ধর্ম বা জাত নয়, আমরা কৃষক। এটাই আমাদের একমাত্র পরিচয়।’ সেদিন থেকে মোদির কপালে ভাঁজ পড়া শুরু। দিন দিন যা বাড়া বই কমেনি। তাই এই মরিয়া প্রচেষ্টা।

সচেষ্ট না হলে ভরাডুবি অনিবার্য। পাঞ্জাব হাতছাড়া আগেই। অকালি দল জোট ছাড়ায় বিজেপি অনাথ। কংগ্রেসত্যাগী অমরিন্দর সিং ও বিজেপি পরস্পরকে আঁকড়ে ভেসে থাকতে চাইছে। কিন্তু আশা ক্ষীণ। আসল চ্যালেঞ্জ উত্তর প্রদেশে। ৪০৩ আসনের বিধানসভায় পশ্চিম উত্তর প্রদেশেই রয়েছে এক–চতুর্থাংশ। ২০১৪ ও ২০১৯–এর লোকসভা এবং ২০১৭ বিধানসভা ভোটে এই তল্লাটের ৭০ শতাংশের বেশি আসন গেছে বিজেপির ঝুলিতে। ৯১ শতাংশ জাট ভোটও বিজেপির। মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু জাট ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে পড়লে পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সাধ্য নেই আদিত্যনাথের তরি ভাসিয়ে রাখে। অভ্যন্তরীণ রিপোর্টেও এই আশঙ্কা। ২০২২ সালে উত্তর প্রদেশে আঁধার নামলে ২০২৪–এর দিল্লি রোশনাই হতে পারে না। নরেন্দ্র মোদি তাই হেঁটমুণ্ড।

মাথা নুইয়েছেন, কিন্তু সংস্কার-প্রচেষ্টার বিসমিল্লায় গলদ স্বীকার করেননি। গণতন্ত্রে জনমত দুরমুশ করা যায় না। সংলাপের স্থান সংঘাত হতে পারে না। বিলগুলো সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হলে কিংবা তারও আগে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনায় বসলে আজকের বিপত্তি হতো না। বিরুদ্ধ মত ও দেশদ্রোহ যে সমার্থক নয়, মোদির করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা সেই প্রমাণ রেখে গেল। প্রধানমন্ত্রী হয়ে যে মহাত্মাকে আঁকড়ে মোদি কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়তে চেয়েছেন, তাঁর অনুগামীরা যাঁর হত্যাকারীকে ঈশ্বরন্যায় পূজা করছেন, সেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বহুকাল আগে বলেছিলেন ‘ইন্ডিয়া লিভস ইন ইটস ভিলেজেস’। কৃষি ও কৃষক সেই ভারতের অন্তরাত্মা। কৃষক আন্দোলন অনেক কিছু শিখিয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা নেবেন কি?

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © 2021 Newsbd.Net